বাউল সম্রাট চলে যাওয়ার ৯ বছর মুরিদানের দান-খয়রাতে মৃত্যুবার্ষিকী পালন

ভাটির বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর ৯ বছর পরও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সমাধিস্থল নির্মাণের প্রতিশ্রুতির চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এর কোনও দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হয়নি।২০০৯ সালের এই দিনে (১২ সেপ্টেম্বর) কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান এই বাউল কিংবদন্তি। বরাবরের মতো আজও এই কিংবদন্তিকে স্মরণ করে ঘরোয়া আয়োজন চলছে উজানধল গ্রামের বাউল বাড়িতে। যেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন বাউল করিমের মুরিদ-আশেকানরা।
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামের বাউল সাধক অদ্বৈত্য দাস আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘আমি ছুডোকাল থাকি করিমওর গান ভালোবাসি। তাইন সর্বজীবরে মায়া করতা। সাধু সন্ন্যাসী বৈষ্ণব আউলিয়া কেউরে তাইন দুশমন ভাবতা না। সব সময় মায়া করতা। এরগতিকে আমি তাইনরে মায়া খরি। সর্ব শাস্ত্র নিয়া বেটা আছলা। তাইন সব জীবরে মায়া করতা, তাইন কচুপাতার মধ্যেও দাগ রাইখা গেছইন। করিম শাহ এমন একটা মানুষ আছলা তাইনর চরণ ধূলি আর আমরা কই পাইমু। আমরার জীবন সার্থক অখন যদি করিম শাহের বাড়িত আমরার মৃত্যু হয় তাও স্বর্গ লাভ হইবো।’

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক খেলু মিয়া বলেন, ‘করিম সাবের মৃত্যুবার্ষিকী যেভাবে পালন করার কথা ছিলো সেভাবে হয় নাই। তিনি ছিলেন গরিব, তার ভক্তবৃন্দরাও গরিব। গরিব আশেকান মুরিদানের দান খয়রাত নিয়ে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। ৯ বছর ধরে এভাবে গরিবানা হাওলাতে মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তাই আমার আকুল আবেদন সরকার যেন তার সমাধির উন্নয়ন করে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার ব্যবস্থা করে।’

এদিকে বাউলপুত্র শাহ নূর জালাল বলেন, ‘টানা ৯ বছর বাবার ভক্তবৃন্দের উদ্যোগে ও সহযোগিতায় মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। অভাব অনটনের কারণে সেভাবে পালন করা যাচ্ছে না। এই বর্ষার মৌসুমে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তবৃন্দরা আসেন, তাদের জন্য কোনও ধরনের সুযোগ সুবিধা দিতে পারি না। বাড়িতে বসার জায়গা নেই। মানুষের স্থান সংকুলান হয় না। জন্মবার্ষিকীতে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি সহযোগিতা করলেও মৃত্যুবার্ষিকীতে বাবার ভক্তবৃন্দ ও আমার সীমিত সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে খুব দরিদ্রভাবে পালন করা হয়।’

বাবার সঙ্গে শাহ নূর জালাল

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন বাউল শাহ আবদুল করিম। জীবদ্দশায় তিনি রচনা করেন আফতাব সঙ্গীত, গণসংগীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে ও শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র নামে বাউল গানের বই। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা।

ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ, প্রেম ও ভালোবাসার পাশাপাশি শাহ আবদুল করিম গানে গানে কথা বলেছেন সব অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ ও দুদ্দু শাহর দর্শন থেকে। তিনি বাউলগানের দীক্ষা লাভ করেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মস্তান বকশের কাছ থেকে।