৯/১১-এর কারণে বাংলাদেশের রফতানি ধাক্কা খেয়েছিল

৯০ দশকের শেষে এবং ২০০০ এর প্রথম দিকে তৈরি পোশাক শিল্পের রমরমা অবস্থা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোটা ব্যবস্থা থাকার কারণে বাংলাদেশে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সম্পদ বাড়ছিল। কিন্তু, ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পরে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো ধাক্কা খায় বাংলাদেশের রফতানি খাতও। এই ধাক্কা সামলে উঠতে সময় লেগেছিল কমপক্ষে দুই বছর। বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন সেই সময়ে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ মিশনে কমার্শিয়াল কাউন্সিলর পদে কর্মরত গোলাম হোসেন।

গোলাম হোসেন বলেন, ‘৯/১১ এর পরে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রফতানি একটি ধাক্কা খায়। তখন কোটার অতিরিক্ত পণ্য পাঠানো এবং ইউএসটিআরের শুনানির বিষয় দুটি ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটনে কর্মরত থাকা হোসেন বলেন, আমরা আমাদের অবস্থান সংহত করেছিলাম এবং দুই বছরের মধ্যে আবার রফতানিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলাম।

বাংলাদেশের রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন চালু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী শ্রম সংগঠন এএফএল-সিআইও আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছিল এবং ২০০১ সালের শেষের দিকে তারা ইউএসটিআর-এ ট্রেড ইউনিয়ন চালুর বিষয়ে একটি আবেদনও করে। তবে এমন আবেদন অবশ্য নতুন ছিল না।  আগেও তারা এ ধরনের আবেদন  করেছিল।

নতুন আবেদন পাওয়ার পরে ইউএসটিআরের পক্ষ থেকে আমাদের শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়। এতে করে ১৯৯৪ সালে বেপজার পক্ষ থেকে দেওয়া ট্রেড ইউনিয়ন চালুর প্রতিশ্রুতি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়।

গোলাম হোসেন বলেন, এটি আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, এই প্রতিশ্রুতি (বেপজার দেওয়া প্রতিশ্রুতি) এর সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা আমাদের উত্তর তৈরি করলাম এবং ইউএসটিআরে জমা দিলাম। একইসঙ্গে এ বিষয়ে লবিয়িস্ট ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।

তিনি বলেন, লবিয়িস্ট ফার্ম এর জন্য ফি হিসাবে ২৫,০০০ ডলার দাবি করলে আমরা আরেকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলাম। কারণ তখন মিশনে এই বিষয়ে কোনও বাজেট ছিল না এবং শুনানির তারিখের সময় এত অল্প ছিল যে ঢাকা থেকে তহবিল সংগ্রহ করার মতো অবস্থা ছিল না।

হোসেন বলেন, ‘আমরা মিশনে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি এবং সেই সময়ে রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্যরা বিশেষ করে উপ-প্রধান মোস্তফা কামাল এবং কাউন্সিলর কামরুল আহসান আমাকে উৎসাহিত করলেন শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য।’

শুনানিতে বাংলাদেশের অবস্থান একটি লবিয়িস্ট ফার্মের বদলে দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করবে এটি জানতে পেরে কোর্টের চেয়ারম্যান বিস্মিত হয়েছিলেন।

অবশেষে আমাদের জবাবে চেয়ারম্যান সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও সময় বরাদ্দ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্য প্রবেশের অনুমতি বহাল রাখেন।

এদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোটার অতিরিক্ত পণ্য পাঠানো নিয়ে  আরও একটি সমস্যার সৃষ্টি হয় যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের গোটা রফতানি খাতের ওপর পড়তে পারতো। কিন্তু আমরা বিষয়টি ভালোমতো সামলে উঠতে পেরেছিলাম।

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রফতানিকারকরা প্রতিবছর তাদের কোটার অতিরিক্ত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠালেও ইউএসটিআর বিষয়টি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখতো এবং ওই পণ্যগুলি তাদের বাজারে ঢোকার অনুমতি দিতো। ২০০১ সালের আগ পর্যন্ত ওই অতিরিক্ত পণ্যের মূল্য বেশি ছিল না কিন্তু ওই বছরে ওই অতিরিক্ত পণ্যের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়ে যায় যা ইউএসটিআরের নজর এড়ায়নি। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রফতানি ছিল দুই বিলিয়ন ডলারের ওপর।

এর ফলে ইউএসটিআর শক্ত অবস্থান নিয়ে জানায় ওই অতিরিক্ত পণ্যগুলো তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে দেবে না। তারা আমাদেরকে জানায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রফতানিকারকদের খরচে ওই অতিরিক্ত পণ্যগুলো বাংলাদেশ অথবা তৃতীয় কোনও দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য।  অন্যথায় তারা এগুলো বাজেয়াপ্ত করে ধ্বংস করে ফেলা হবে এবং এর সম্পূর্ণ ব্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি রফতানিকারকদের বহন করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘চিন্তা করে দেখেন, আমাদের রফতানি দুই বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি এবং এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলার তারা পরিশোধ করবে না এবং এর সঙ্গে আনুষাঙ্গিক যত ক্ষতিজনিত খরচ আছে সেটিও বাংলাদেশের রফতানিকারককে বহন করতে হবে। সবগুলো যোগ করলে অঙ্কটির পরিমাণ অনেক বেশি দাঁড়ায়।’

‘আমরা সেই সময়ে ইউএসটিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ও শুল্ক দফতরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম এবং তাদেরকে বোঝানোর জন্য চেষ্টা করতাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর কী পরিমাণ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু তাই নয়, আমরা এএফএল-সিআইও, বিভিন্ন চেম্বার, আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলতাম তারাও যেন বিষয়টি তাদের প্রশাসনকে বুঝিয়ে বলে।’

অবশেষে আমরা তাদের সমর্থন নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলাম, জানান তিনি।

গোলাম হোসেন বলেন, ২০০২ এর শেষ প্রান্তিকে আমরা ইউএসটিআর-এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করলাম এবং এরপরই আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করি। সবগুলো বৈঠকই অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তারা অতিরিক্ত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল।