লিড নিউজ

৩শ টাকার চামড়া রফতানি হয় ৫ হাজার টাকায়

দেশে ৬০ ভাগ চামড়া সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদে। কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা এতিম-অসহায়দের হক। তাদের মাঝেই এই টাকা বণ্টন করে থাকেন কোরবানিদাতারা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যূনতম মূল্য দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অথচ মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনে সেই চামড়া ট্যানারি মালিকরা রফতানি করছেন সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকায়। আর কোরবানির ঈদ এলেই ট্যানারি মালিকরা কীভাবে পানির দামে চামড়া কেনা যায়, সেই পাঁয়তারা শুরু করেন। তাদের তৎপরতায় বঞ্চিত হয় এতিম-অসহায়রা।

এবারও ঈদুল আজহায় সারা দেশে ৯১ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছে। মৌসুমি বা ছোট ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদাররা কোরবানির চামড়া কিনছেন না। তারা চামড়ার দাম কম থাকায় দোষ দিচ্ছেন ট্যানারি মালিকদের। আর ট্যানারির মালিকরা বলছেন, দুই কারণে এবার কোরবানির চামড়া দাম পায়নি। প্রথমত, ট্যানারিওয়ালারা পর্যাপ্ত ঋণ পাননি। দ্বিতীয়ত, চামড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিকভাবেই পড়ে গেছে।

অথচ বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় চামড়া রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে ৬ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছিল, সেখানে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ হাজার ৩ কোটি টাকার রফতানি হয়েছে। ১ বছরের ব্যবধানেই ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেশি রফতানি হয়েছে এই খাতে। আর শুধু জুলাইয়েই ৭৫০ কোটি টাকার রফতানি হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের বাজারেও চামড়া জাতীয় পণ্যের দাম কম নয়। দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা লাভ করছে। বঞ্চিত হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়ার আসল হকদার এতিম-অসহায়রা।

সাধারণত একটি গরুর আকার ভেদে চামড়া ১৫ ফুট থেকে ৪০ ফুট, মহিষ ২০-৪৫ ফুট, ছাগলের চামড়া ৪-৫ ফুট হয়ে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী চামড়ার দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম ৫০ সেন্ট থেকে দেড় মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম দাঁড়ায় ৪৩ থেকে ১২৯ টাকা। এ হিসেবে প্রতিটি লবণযুক্ত গরু-মহিষের চামড়ার দাম সর্বনিম্ন ৭০০ টাকা থেকে ৫ হাজার ১শ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর একটি লবণযুক্ত ছাগলের চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৬৫০ টাকা হতে পারে।

তবে দেশের ব্যবসায়ীরা গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার বেশি দামে কিনেন না। আর সবচেয়ে বড় ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে গেলে ৫০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যায় না। চামড়া ব্যবসায়ীরা মধ্যস্থতাকারী হয়ে কোটি কোটি টাকা কামালেও কোরবানির চামড়ার আসল ভাগিদার এতিমরা কিছুই পায় না।

এদিকে গত (২০২০-২১) অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এদিকে গত জুলাইয়েও ২ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

কাঁচা চামড়ার দাম কমের বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি শাখাওয়াত উল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত দামেই চামড়া সংগ্রহ করছি। ৮ থেকে ১০ দিন আগে থেকে লবণ দেওয়া চামড়া সংগ্রহ শুরু করেছি, যা আরও এক থেকে দেড় মাস চলবে। তবে তিনি জানান, যারা পোস্তায় লবণ দিয়ে চামড়া বিক্রি করেছেন, তারা ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার কমে চামড়া বিক্রি করেননি।

চামড়া রফতানি বাড়লেও দেশে কেন চামড়ার দাম কম- জানতে চাইলে চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দামেই চামড়া সংগ্রহ করছি। কম দামে চামড়া বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে নাই। এগুলো দেখা যাচ্ছে সিলেটে হয়েছে, বরিশালে হয়েছে।’ সিলেট, বরিশালে এমন ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে জিজ্ঞেস করলেই ভালো হয়। সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। আমাদের মার্কেটে এমন ঘটনা ঘটে নাই।’

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button