রংপুর বিভাগসারাদেশ

এলইডি হেডলাইট: সৈয়দপুরে রাতের সড়ক যেন মৃত্যুপুরী

নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি: বাস চালক একরাম হোসেন। বাস চালিয়ে  যাচ্ছিলেন দিনাজপুর থেকে রংপুরের দিকে। এমন সময় নীলফামারীর সৈয়দপুর বাইপাস সড়কে হার্ডবোর্ড ফ্যাক্টরির সামনে  উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা চোখ ধাঁধানো আলোয় খেই হারিয়ে ফেললেন। কি করবেন, বুঝে উঠতে না পেরে অগত্যা দ্রুত ব্রেক কষে দিলেন।  বাস সজোরে সড়কের পাশের একটি গাছকে  ধাক্কা মারে। অল্পের জন্য বাস ভর্তি যাত্রীর প্রাণ বেঁচে গেলেও বাসের হেলপারের পা গেলো থেতলে।
এদিকে মোটরসাইকেল চালক আরিফুল ইসলাম শহরের ইসলাম বাগ থেকে যাচ্ছিলেন  এয়ারপোর্ট রোড হয়ে চৌমুনীর দিকে । ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন জমিদার পঁচা সরকার ব্রীজ  পার হওয়ার পরেই তীব্র সাদা আলোর ঝঁলকানিতে পথ হারিয়ে ফেললেন তিনি। ডানে-বায়ে-সামনে কোনো কিছু দেখতে না পেলেও সড়কে গাড়ি কম থাকায় আন্দাজের ওপর বাইকের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। এভাবেই নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেও মাঝে মাঝেই রক্ষা পেয়ে যান তিনি। তবে আরিফুলের ভয় কোনদিন যেন ওই সাদা আলোই জীবনে অন্ধকার টেনে আনে!
যে সাদা আলোর কথা বলা হচ্ছে, তা আর কিছুই না- মোটরযানে লাগানো এলইডি  লাইটের আলো। ইদানিং নীলফামারীর সৈয়দপুরে  প্রায় সব ধরনের যানবাহনে  হেডলাইট হিসেবে  শুরু হয়েছে তীব্র সাদা আলোর এলইডি লাইটের ব্যবহার। এ লাইটের আলো এতটাই তীব্র যে চোখে এসে পরলে  বিপরীত দিক থেকে আসা কিছুই দেখা যায় না।  এর ফলে  সন্ধা নামলেই  সড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো  যেন মৃত্যুপুরী হয়ে পড়েছে।   মৃত্যুঝুকি বাড়লেও তা নিয়ে প্রশাসন বা পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোন মাথা ব্যাথা নেই। চিকিৎসকরা বলছেন এর  আলো চোখের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গাড়ির হেডলাইট সাধারণত তিন ধরনের হয়। এগুলো হলো হ্যালোজেন, জেনন ও এলইডি (লাইট এমিটিং ডাইয়ড)। তবে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে হ্যালোজেল হেডলাইট, এটিও সাদা আলো দেয়। তবে এলইডি লাইটের মতো তীব্র নয়। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির সাদা আলোর কারণে চালকের দেখতে অসুবিধা হয় বলে, হেডলাইটের উপরের অংশে দুই ইঞ্চির মতো জায়গায় কালো কালির প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু এখন আর সেটা মানছে না কেউ। এর ওপর শুরু হয়েছে এলইডি হেডলাইটের ব্যবহার।  বৃহস্পতিবার সন্ধার পর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ  পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে, রিক্সা, অটোরিক্সা, ইজিবাইক,কার প্রাইভেটকার, পিক-আপসহ প্রায় সব ধরনের যানবাহনে লাগানো হয়েছে এলইডি লাইট। আর  একাধিক এলইডি হেডলাইট লাগিয়ে দ্রুত গতিতে  মটরসাইকেল নিয়ে চলছে উঠতি বয়সী ছেলেরা।  পয়েন্টগুলোতে অবস্থান করে দেখা গেছে প্রতি পাঁচটি গাড়ির মধ্যে অন্তত তিনটি গাড়িতে তীব্র আলো সৃষ্টিকারী এলইডি হেডলাইট লাগানো হয়েছে।  এসব লাইটের আলো  বিপরীত দিকে তীব্রভাবে পড়ছিল।  যা থেকে যেকোনো মুহুর্তে ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা। ইজিবাইক চালক রাশেদ বলেন,আমার গাড়ির হেডলাইটের উপরে কালো কালি লাগানো আছে । কিন্তু  মাঝে মধ্যে অভিযান হলে অধিকাংশরাই টাকা দিয়ে পাড় পেয়ে যায়।  এ ব্যাপারে  নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের সৈয়দপুর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কামাল ইকবাল ফারুকী জানান, রাতে  তীব্র সাদা আলো উৎপাদনকারী হেডলাইটে সড়ক-মহাসড়কে দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেকে। যা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর উপজেলার বিভিন্ন সড়কে ৩১টি দূর্ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এসব দূর্ঘটনা কারনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হেডলাইটের তীব্র সাদা  আলো চালকদের চোখে পরে নিয়ন্ত্রণ হারানো। আর লাইট পথচারীদের চোখের জন্যও নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। সৈয়দপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ  ডা: আরমান হোসেন রনি  জানান, এলইডি হেডলাইটের তীব্র আলো যদি সরাসরি চোখে পড়ে তাহলে চোখের মারাত্বক ক্ষতি হয়। এমননি ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এতকিছুর পরও এ তীব্র আলোর হেডলাইটের মটরযানগুলো সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাফিক পরিদর্শক নাহিদ পারভেজ দৈনিক সকালের সময়কে  জানান, যে সকল যানবাহনে এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয় সেগুলো আটক করে লাইট খুলে ফেলা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন কারনে অভিযান কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও অভিযান নিয়মিত চলছে। এ ব্যাপারে তিনি সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button