খুলনা বিভাগসারাদেশ

বাল্য বিয়ে আইনের তোয়াক্কা করছেন না কেউ

রাজবাড়ী প্রতিনিধি: যে বয়সে ছেলে-মেয়েদের বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা এবং সাথীদের নিয়ে বাড়ির উঠোন কিংবা বাগানে খেলাধুলা করার কথা। ঠিক সেই বয়সেই লেখাপড়া কিংবা খেলাধুলার পরিবর্তে স্বামীর বাড়িতে সংসার বুঝে নেয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের।
ফলে বছর পেরুতে না পেরুতেই হচ্ছে অপরিপক্ব সন্তানের মা, ঘটছে বিচ্ছেদের মতো ঘটনাও। এ বিষয়ে শুধু আইন করলেই হবেনা, প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনসচেতনতামুলক সামাজিক কার্যক্রম।
বাল্যবিয়ের রেকর্ড ভঙ্গ করেই চলেছে রাজবাড়ীর পাংশা, কালুখালি ও গোয়ালন্দ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন। এখানে আনাচে কানাচে হরদম চলছে বাল্য বিয়ে। এ যেন অনেকটা বাল্য বিবাহের মেলা। অবাধে বিয়ের ব্যাপারে কেউ আইন ও প্রশাসনের তোয়াক্কা করছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে স্কুল ও মাদ্রাসার ছাত্রীরা। তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। ফলে সমাজে বাল্য বিয়ের শিকার অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কেউ কেউ হচ্ছে তালাকের শিকার। আবার কেউবা শিকার হচ্ছে একাধিক বিয়ের।
গত ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত গত এক বছরে এই উপজেলাগুলোর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণীতে পড়ুয়া দুই শতাধিক ছাত্রী বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে। প্রশাসন, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাল্য বিবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়ে বিবাহ সম্পন্ন করে।
সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌতুক প্রথা, দারিদ্র্যতা ও কাজীর অসহযোগিতার কারণে এসকল এলাকাগুলোতে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না বলে অভিজ্ঞ মহলের মতামত। বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিরা তেমন কোন ভূমিকা পালন করছেন না। বরং ভোটের চিন্তা আর কখনো কখনো অর্থের প্রলোভনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে তারাও।
গত অক্টোবরে বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে বাল্য বিয়ের যা তথ্য পাওয়া গেছে তা হতবাক করার মত। চলতি বছরে পাংশা উপজেলায় ৫৯ জন, কালুখালি উপজেলায় ৪৩ জন, গোয়ালন্দ উপজেলায় ৭৬ জন সহ মোট দুই শতাধিক স্কুল ও মাদ্রাসা ছাত্রী বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে আর এর মধ্যে তালাক প্রাপ্ত হয়েছে ৩১ জন। ১৩ ছাত্রী গিয়েছে ২য় স্বামীর ঘরে।
গত আগস্টে পাংশা উপজেলার মাছপাড়া ইউনিয়নের মাছপাড়া গ্রামের মিম (১৩) (পিতা নাসির) নামে ৮ম শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্রীর বিয়ের খবর পেয়ে পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতির কারণে তা সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত থাকলেও পরে মাছপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সহযোগীতায় তা সম্পূর্ণ হয়।
জানা যায়, কাজীরা অনেক ক্ষেত্রে জন্ম সনদে বয়স সঠিক না থাকায় মূল ভলিউমে বিয়ে নিবন্ধন না করে কৌশলে নিজে কিংবা অন্য কোন মাধ্যেম দিয়ে আলাদা একটি ফরমে কনে ও বরের তথ্য লিখে রেখে দেন। পরবর্তিতে এ বিয়ের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বিয়ে পড়াননি বলে এড়িয়ে যান।
গত ফেব্রুয়ারিতে কালুখালি উপজেলা এলাকায় বাবার বিরুদ্ধে জোর করে বাল্য বিয়ে আয়োজনের অভিযোগ করেছিল মহিসভাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর এক ছাত্রী (০৯)। অভিযোগ পেয়ে ওই ছাত্রীর বাবা ছকমল হোসেন (৪৫) এর ১ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। জরিমানা করার পরও সেই ছাত্রীটি বিয়ে থেকে রক্ষা পায়নি।
আইন না মেনে অবাধে বাল্য বিয়ে হওয়াতে একদিকে যেমন স্কুল-মাদ্রাসা থেকে ঝড়ে পড়ছে শিক্ষার্থী, অন্যদিকে বাল্য বিয়ের বহু কুফল পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র। অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে সু-স্বাস্থ্য, উচ্চ শিক্ষা, পরিপূর্ণ সংসার গঠন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক মেয়েরাই। ফলে সরকারের লক্ষ উদ্দ্যেশ্য ব্যহত হচ্ছে। দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে ওদের স্বাস্থ্য। বিয়ের পর স্বামীসহ শশুরালয়ের লোকজনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পাড়ায় নারী নির্যাতন ও বিয়ে বিচ্ছেদ বাড়ছেই।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button