ঢাকা বিভাগ

ফি দিতে দেরি হওয়ায় পেটের মধ্যে টিউমার রেখেই সেলাই

মানিকগঞ্জ জেলা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় টিউমার অপারেশন করতে এসে পেটের টিউমারটি বের না করে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শনিবার ভোরে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এ অমানবিক ঘটনার শিকার হয়েছেন আফরোজা আক্তার নামের এক গৃহবধূ। রোববার ভুক্তভোগী রোগী ও তার স্বজনরা এ অভিযোগ করেন।

অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. খায়রুল হাসান বলেন, একটি অপারেশন করতে গিয়ে আরেকটি অপারেশন প্রয়োজন পড়লে তার জন্য বাড়তি তিন হাজার টাকা ফি দাবি করেছি। টাকা চাওয়াটা তো আমার ভুল হয়নি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর আবারো অজ্ঞান করা লাগতে পারে; অথবা অন্যকোনো সমস্যা হতে পারে- এমন ভাবনা থেকেই আমি আর টিউমার অপসারণের অপারেশনটি করিনি। অপারেশনটি পরে করলেও চলবে।

অভিযোগে জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে জেলার সাটুরিয়া উপজেলার নয়াডিঙ্গী গ্রামের দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী ওই গৃহবধূকে ভর্তি করা হয় ওই হাসপাতালে। প্রসব যন্ত্রণা উঠায় রাত ২টার দিকে তাকে নেওয়া হয় অপারেশন থিয়েটারে।

অপারেশন করতে আনা হয় ডা. খায়রুল হাসান এবং অজ্ঞানের চিকিৎসক ডা. আশিককে। গর্ভবতী ওই নারীকে ৪৫ মিনিট পর্যবেক্ষণের পর তারা অপারেশন শুরু করেন। একটি সুস্থ কন্যাশিশু হয় তার। অপারেশন শেষে ওই নারীর পেটে একটি টিউমার দেখতে পান চিকিৎসকরা। তিন হাজার টাকা দিলে তিনি অপারেশন করে টিউমার অপসারণ করবেন বলে রোগীর স্বজনদের জানান। কিন্তু এ টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তিনি পেটের মধ্যে টিউমার রেখেই সেলাই করে চলে যান।

ওই নারীর স্বামী বলেন, আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। আমি গরিব মানুষ। আমার গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকায়, অন্য হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক ডেকে আনা হয়। অপারেশন শেষে পেটে টিউমার ধর পড়ার পর চিকিৎসক টিউমার অপসারণ করতে তিন হাজার টাকা চান। আমি তার প্রস্তাবে রাজি হই এবং টাকাটা নগদ তাকে দিতে চাই কিন্তু ভোরে বিকাশের দোকান বন্ধ থাকায় এবং টাকাটা সংগ্রহ করতে একটু দেরি হওয়ায় তিনি পেটের মধ্যে টিউমার রেখেই সেলাই করে চলে যান। আমিসহ আমার পরিবারের সদস্যরা তাকে বারবার অনুরোধ করি। হাসপাতালের লোকজনও তাকে বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি কারও অনুরোধই রাখেননি। একজন চিকিৎসক যদি এতটা অমানবিক হয়, তাহলে আমাদের মতো নিরীহ মানুষ কোথায় যাবে?

ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, আমার পেট থেকে সন্তান বের করার পর কমপক্ষে আধাঘণ্টা আমাকে সেখানে পেট কাটা অবস্থায় ফেলে রাখে। তারপর পেটে টিউমারটি রেখেই সেলাই করে দেয়। এ টিউমার অপসারণ করতে আবার পেট কাটতে হবে। মাত্র তিন হাজার টাকার জন্য তিনি আমার সঙ্গে এমন করলেন, তিনি কেমন ডাক্তার?

ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সার্বক্ষণিক থাকলেও সার্জারির চিকিৎসক অধিক রাতে থাকেন না। এ কারণে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সার্জারির চিকিৎসকদের ডেকে এনে অপারেশন করাই। ডা. খায়রুল হাসানকে ডাকলে তিনি অজ্ঞানের চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত চলে আসেন। তাকে রাতের ডাক্তারও বলা হয়।

তিনি বলেন, শুক্রবার রাতে আমার শরীরটা খারাপ থাকায় আমি একুট আগেই শুয়ে পড়ি। তিনি অপারেশন শুরু করার পর রোগীর লোকজন আমাকে ফোন করে আসতে বলেন। আমি চিকিৎসককে অনুরোধ করে বলি, রোগী টাকা না দিলে আমি তাকে টাকা দেব। কিন্তু তিনি তা না করে, পেটের মধ্যে টিউমার রেখে সেলাই করে চলে যান। এটি অত্যন্ত অমানবিক। এতে আমার হাসপাতালেরও সুনাম নষ্ট হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. লুৎফর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি। এটা অত্যন্ত অমানবিক। এ ধরনের একজন, দুজন চিকিৎসকের অমানবিক আচরণের কারণে গোটা চিকিৎসক সমাজের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। ভুক্তভোগীর স্বজনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করলে অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button