জাতীয়

ক্ষুদ্র অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে

করোনার দীর্ঘকালীন অভিঘাতে থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। তদুপরি সর্বশেষ ঈদ-উৎসবেও ব্যবসার চাকা ঠিকঠাক না চলায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ পেয়ে কোনো রকম টিকে থাকতে পারলেও মাঝারিরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মক সংকটে আছেন; পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। কোরবানির ঈদের আগে এক সপ্তাহের জন্য মার্কেট-দোকানপাট খোলা রাখার সরকারি অনুমতি থাকলেও কপাল খোলেনি তাদের। লোকসান গুনতে হয়েছে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদেরও। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজি হারিয়ে জীবনধারণে বিকল্প পেশার সন্ধান করছেন তারা।

১০ বছর ধরে কাপড়ের ব্যবসায় জড়িত মাতুয়াইলের বাসিন্দা মো. দুলাল হাওলাদার। আড়াই বছর হয় খুচরা বিক্রেতা থেকে পাইকারি ব্যবসা শুরু করেছেন দুলাল। অতিকষ্টে তিল তিল করে সঞ্চিত অর্থ ও ঋণ করে দাঁড় করানো দুলালের ব্যবসা আলোর মুখ দেখার আগেই সব তছনছ করে দিয়েছে করোনা পরিস্থিতি। এমনিতে ঘাড়ে পুরনো দেনার বোঝা, তার ওপর লকডাউনে সংসার চালাতে নতুন করে ঋণ করতে হচ্ছে। এবার কোরবানি ঈদ সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের ‘কমফোর্ট জোনের’ এ তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, জমানো টাকা ও ঋণ করে ব্যবসা শুরু করেছি। অথচ শুরুতেই একের পর এক হোঁচট খাচ্ছি। ঋণ করেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। এবার কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ করে পণ্য তুলেছি দোকানে। কিন্তু বিক্রি করতে পারলাম না। আমাদের পাইকারি মার্কেটে যে সময়টায় ব্যবসা হয়, সে সময়টাতেই কঠোর লকডাউন। ঈদের আগের সপ্তাহে মার্কেট খুললে পাইকারি পণ্যের ব্যবসায়ীদের কোনো লাভ হয় না। শেষমেশ খুচরা বিক্রির চেষ্টাও করেছি। তিনি বলেন, আমার দোকান এখন পণ্যে ভরা। বিক্রি নেই তো ব্যবসাও নেই। সত্যি বলতে কি, আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দেনা করে পাঁচজনের সংসার কতদিনই বা চালানো যায়? দুলাল হাওলাদার জানান, তিনি এখন বিকল্প কোনো পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

একই কথা জানালেন যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কের ফুটপাত ব্যবসায়ী মো. আলমগীর হোসেন। ছয় বছর ধরে গড়ে তোলা শিশুদের জামাকাপড়ের দোকান বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি। আলমগীর বলেন, দেনার বোঝা বাড়ছে। একে একে চারটি ঈদ ও দুটি পহেলা বৈশাখের বাজার হারালাম। দোকান খুলেও লাভ নেই। মানুষের পকেটে এখন টাকা নেই। কিনবে কী দিয়ে? এখন ফুটপাতের ব্যবসাতেও টান পড়েছে। করোনা কবে বিদায় হবে তারও ঠিক নেই। মাথায় অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে দেনা করে কতদিন সংসার চালানো যায়? ভাবছি, গ্রামে চলে যাব।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, ঈদ, পহেলা বৈশাখসহ একের পর এক উৎসবের বাজার হারিয়ে খাদের কিনারায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে করুণ দশা অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। কারণ তারা এক রকম দিন এনে দিন খায়। একদিনের জায়গায় দুদিন ব্যবসা বন্ধ রাখলে তাদের ঘরে চুলা জ্বালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অবশ্যই লকডাউন প্রয়োজন। তবে সেটা দীর্ঘায়িত হলে এসব ব্যবসায়ীর পরিবারকে অনাহারে দিন কাটাতে হয়।

হেলাল উদ্দিন জানান, স্বাভাবিক সময়ে কোরবানির ঈদ ঘিরে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এবার ঈদের আগে এক সপ্তাহ দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হলেও তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। খুব বেশি হলে ৫০০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে। তিনি বলেন, বড় ব্যবসায়ীরাই বিপর্যস্ত। ছোটদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে পুঁজি হারিয়েছেন। তারা ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার চিন্তা করছেন। গত বছর অর্ধকোটিরও বেশি ক্ষুদ্র ও অণু ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে আবারও সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এবারের কোরবানির ঈদকে ঘিরে অনেকে ঋণ করে বিনিয়োগ করেছিলেন। অথচ ব্যবসা করতে পারেননি। ইতোমধ্যেই অনেক অণু ব্যবসায়ী হতাশ হয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। সহযোগিতা না পেলে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন তাদের ব্যবসাটি হারাবেন।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশে সরকার ঘোষিত ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ চলছে। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের দোকানপাট, গণপরিবহন এবং শিল্পকারখানা বন্ধ রেখে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহের এ লকডাউন। চলবে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত। বিধিনিষেধ নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে। এবারের বিধিনিষেধে প্রশাসন গতবারের চেয়েও কঠোর থাকবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

রাজধানীর নিউ সুপারমার্কেটের টিএস ফ্যাশনের ব্যবসায়ী এআর সোহেল বলেন, একের পর এক লকডাউনের কারণে দোকান বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে নেই। ঈদের আগে এক সপ্তাহের জন্য দোকান খুললেই কি আর না খুললেই কি। ঈদের মূল বাজার শুরু হয় এক মাস আগে থেকে। ঈদের আগ মুহূর্তে দোকান খোলায় বরং খরচ বেড়েছে।

হতাশা-ভরা কণ্ঠে সোহেল বলেন, কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে খরচ কমছে না। গতবার এক মাসের দোকান ভাড়া মওকুফ করা হলেও। এবার এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তও আসছে না। দেনা করে আর ব্যবসা টেকানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনটা চললে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আয়-রোজগার তো করতে হবে। সংসার তো চালাতে হবে। বেকার বসে থেকে দেনা হিসাব করার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই। এর থেকে মুক্তি কবে মিলবে জানি না।

 

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button