জাতীয়

কয়েক কোটি জন্ম নিবন্ধন সনদ ‘গায়েব’

নাগরিক কর্মকাণ্ডের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ছে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির। যাদের এনআইডি নেই, তাদের ক্ষেত্রে দরকার হচ্ছে জন্ম নিবন্ধনের। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, আগে বিশেষ করে ১০ বছর আগে যেসব জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছিল সেগুলোর প্রমাণ হিসেবে হাতে কাগজ থাকলেও সার্ভারে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না! সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সার্ভারের গোলযোগে এসব তথ্য মিসিং হয়ে গেছে। সবাইকে আবার নতুন করে জন্ম নিবন্ধন করতে হবে।
জানা গেছে, সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদ করতে বাবা-মায়ের জন্ম সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় বহু অভিভাবক নিজেদের জন্ম নিবন্ধন সনদ সার্ভারে দেখতে গিয়ে পাননি। এরপরই বিষয়টি সামনে আসে।
বাংলাদেশে এখন প্রায় চার কোটি স্কুল শিক্ষার্থীর জন্য ডিজিটাল ইউনিক আইডি তৈরির কাজ চলছে, যার জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন সনদের আবেদন করতে হলে আবার তাদের বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ অবস্থায় বহু অভিভাবক দেখছেন যে তাদের আগে নেওয়া জন্ম সনদ এখন আর সরকারি সার্ভারে প্রদর্শন করছে না।
বিবিসি বাংলা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন- আগে জন্ম নিবন্ধন করে সনদ নিয়েছেন এমন কয়েক কোটি মানুষকে এখন সম্পূর্ণ নতুন করে অনলাইনে জন্মনিবন্ধন করাতে হবে। কারণ তাদের আগের নিবন্ধন গায়েব হয়ে গেছে।
তারা বলছেন, এসব ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন অনলাইনে আপডেট করা হয়নি এবং এখন নতুন সার্ভারে আর পুরনো তথ্য স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি স্কুল শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশের আবার একাধিক অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের ঘটনাও বেরিয়ে এসেছে, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষ বলছে, আগে যারা ম্যানুয়ালি জন্ম সনদ নিয়েছেন তাদের মধ্যে যারা নিজ উদ্যোগে বা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন অফিস থেকে অনলাইনে অ্যান্ট্রি করেননি তাদের জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য সার্ভারে আর নেই। তাদের এখন সম্পূর্ণ নতুন করে আবেদন করে জন্ম নিবন্ধন নিতে হবে বলেছেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ফখরুদ্দিন মোবারক।
বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার জেনারেল মির্জা তারিক হিকমত বলেন, ‘আগে যারা ম্যানুয়ালি জন্ম সনদ নিয়েছে তাদের তথ্যাদি অনলাইনে আপডেট করার জন্য ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় ছিল। এগুলো নিবন্ধন অফিসগুলোরই করার কথা। ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেকটা হয়েছেও। কিন্তু পৌর এলাকাগুলোতে এটি হয়েছে খুব কম। যে কারণে বহু মানুষের তথ্য এখন আর অনলাইনে নেই। এখন আবার নতুন সার্ভারে পুরনো তথ্য স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে যাদেরটা বাদ পড়েছে তাদের নতুন করে জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে।’
তবে এটি সংখ্যায় কত সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন তারিক হিকমত।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ফখরুদ্দিন মোবারক বলেন, ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় পনেরো লাখ সনদের তথ্য আপলোড হয়েছে। তবে অনেকের তথ্যই আপলোড হয়নি বলে তাদের এখন নতুন করে নিবন্ধন করাতে হবে।
এদিকে ২০১৩ সালে সরকার আইন সংশোধন করে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়কে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়, যা ২০১৬ সাল থেকে কাজ শুরু করে। এর মধ্যে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের নতুন ওয়েবসাইট ও সার্ভার চালু করা হয়, যা ২০১২ সালে কার্যক্রম শুরু করে।
সে সময় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পুরোনো নিবন্ধিতদের জন্মনিবন্ধন সনদ নতুন ওয়েবসাইটে যুক্ত করে নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বেশিরভাগ মানুষের অগোচরেই থেকে যায়। ফলে এ আহ্বানে খুব বেশি সাড়া মেলেনি। আর যারা এটি করেনি বা নিবন্ধন কার্যালয়গুলোও নিজ থেকে যেগুলো আপলোড করেনি সার্ভারে সেগুলো আসলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে গেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালের পর থেকে সব জন্ম নিবন্ধন অনলাইনেই হচ্ছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগের তথ্যগুলো অনলাইনে আপলোড করার সুযোগ ছিল।এরপর নতুন সার্ভার আসে কিন্তু সেটিতে আর পুরনো তথ্য আপলোড করার সুযোগ না থাকায় ২০১১ সালের আগে করা বহু নিবন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে গায়েব হয়ে যায়। অর্থাৎ সেগুলো অনলাইনেই কখনো আসেনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার পঞ্চম শ্রেণিতে পিএসসি পরীক্ষার সময়েও জন্ম সনদ দিতে হয়।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button