জাতীয়

পরীমণি-হেলেনাদেরতদন্ত কোন পথে

facebook sharing button
twitter sharing button
linkedin sharing button
blogger sharing button
pinterest sharing button
email sharing button
sharethis sharing button
পরীমণি-হেলেনাদেরতদন্ত কোন পথে
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১, ১:৩৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 33
   

 

চিত্রনায়িকা পরীমণি থেকে মৌ-পিয়াসাসহ সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া হেলেনা জাহাঙ্গীর ও ঈশিতাদের মামলার তদন্ত নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেফতারের পর থেকে এখন পর্যন্ত র‌্যাব, ডিবি পুলিশ ও সিআইডি তাদের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও গণমাধ্যমে দেওয়া সব সংস্থার বক্তব্য ছিল অনেকটা একই ধরনের। বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে পরীদের সঙ্গে সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালীদের একান্ত সম্পর্ক এবং তাদের আসরে এসব ব্যক্তির নিয়মিত যাতায়াতের তথ্য পায় সংস্থাগুলো। একই সঙ্গে এসব প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানায় তারা। কিন্তু গ্রেফতারের পর থেকে এখন পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডিএমপি কমিশনার পরীমণিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা কারও তালিকা হচ্ছে না- এমন মন্তব্য তদন্তের বিষয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়। যার কারণে প্রকৃতপক্ষে মামলার তদন্ত কোন পথে মোড় নিচ্ছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। তার মাঝেই মৌ-পিয়াসা ছাড়া পরী-হেলেনাদের ১০টি মামলার তদন্তভার চেয়ে র‌্যাবের আবেদন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রেফতারের শুরুতে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল এখনও সেগুলোই বলা হচ্ছে। বহু প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধরদের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কারও নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। উল্টো সমাজে নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকজন নারীকে হয়রানির পাশাপাশি ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন অনেক নারীবাদী সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে তদন্ত সংস্থাগুলোর অগ্রগতি না থাকা সত্ত্বেও বারবার গণমাধ্যমে হাজির হওয়া ও মামলার টানাটানি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তদন্ত সংস্থাগুলো গণমাধ্যমে হাজির হয়ে নিজেদের মুখ দেখিয়ে কভারেজ পাওয়াকেই এখন দায়িত্ব ও সার্থকতা মনে করছেন। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা শক্তির দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে আইনের ভিত্তিতে যথাযথভাবে মামলার তদন্ত পরিচালনার কথা বলেন তারা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী শীপা হাফিজা গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, পরীমণিকে গ্রেফতার ও আদালতে হাজির করার সময় তার চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্যকে পাহারায় দেখা গেছে। মনে হয়েছে- পরীমণি বড় ধরনের অপরাধী বা ডাকাত। তিনি বলেন, পরীমণিসহ সম্প্রতি যেসব নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। হঠাৎ করে এতগুলো নারীকে গ্রেফতার অন্যায়, অমানবিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। পুরো ঘটনায় মিডিয়াও নির্লজ্জভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ নিয়েছে। এমনভাবে চলতে থাকলে অন্তরালে থাকা প্রভাবশালীরা পরবর্তীতে অন্য কারও ওপর জেঁকে বসবে।
জানা যায়, গত ১ জুলাই রাতে প্রথমে বারিধারা থেকে মডেল পিয়াসা ও পরে মোহাম্মদপুর থেকে মডেল মৌকে বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদসহ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরবর্তীতে ৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান ও তার সহযোগী মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ৪ আগস্ট বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত বনানীতে পৃথক অভিযানে পরীমণি ও তার ম্যানেজার দীপু এবং নজরুল রাজ ও তার ম্যানেজার সবুজ আলীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ ছাড়া হেলেনা জাহাঙ্গীরকে ২৯ জুলাই ও ঈশিতাকে ১ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, র‌্যাবের অভিযানে পরীমণিসহ কয়েকজন গ্রেফতারের পর মামলার তদন্তভার ডিবিতে যাওয়ার পরপরই পরীমণির সঙ্গে ডিবির গুলশান বিভাগের এডিসি গোলাম সাকলায়েনের ‘প্রেমের সম্পর্কের’ তথ্য প্রকাশ পায়। এ নিয়ে তোলপাড় ও সমালোচনা শুরু হয়। তখন সমালোচনা এড়াতে পরীমণির মামলাসহ ৭টি মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
সিআইডি সূত্র জানায়, দায়িত্ব পাওয়ার পর তাদের তদন্ত ও গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে বহু প্রভাবশালীর নামসহ চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পায়। সংস্থাটি এই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার ৬ জনের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন আলামতসহ অনেক কিছু জব্দও করে। কিন্তু পরবর্তীতে তারাও বেশ কয়েকবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলে সেসব প্রভাবশালীসহ নেপথ্যে থাকাদের সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। সংস্থাটি জোরালোভাবে তদন্তকাজ শুরু করলে তাদের কাছে নানা ধরনের তদবির ও চাপ আসতে শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যেই মৌ-পিয়াসা ছাড়া র‌্যাব যাদেরকে গ্রেফতার করেছে এমন ১০টি মামলার তদন্তভার চেয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দফতরে চিঠি দেওয়া হয়।
পরীমণি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত সোমবার বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে হয়রানি করা হবে না। কারও নাম বললেই হবে না, যাচাই-বাছাই করতে হবে। গণমাধ্যমে নাম প্রকাশের পর কয়েকজন ব্যবসায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন এমন গুঞ্জনও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
গতকাল দুপুরে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন- পরীমণি, মডেল পিয়াসা ও মৌয়ের বাসায় যাতায়াত ছিল এমন ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিদের কোনো তালিকা করা হচ্ছে না। মডেল ইস্যুতে এই চক্রটি সমাজের বিশিষ্টজনদের কাছে ফোন করে তালিকায় তাদের নাম থাকার কথা বলে চাঁদা দাবি করছে। আমরা চাই না এমন আতঙ্ক ছড়াক, বিনা কারণে কারও সম্মানহানি ঘটুক। তিনি বলেন, সাকলায়েন আইনগত কোনো অন্যায় করেননি। তবে নৈতিকতার প্রশ্নে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের চিঠির বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে তদন্তভার চাওয়া হয়েছে। এখানে অন্য কোনো বিষয় নেই। মৌ-পিয়াসা ছাড়া অন্য অভিযানগুলো যেহেতু র‌্যাব চালিয়েছে, সে জন্য গুরুত্ব বিবেচনায় মামলাগুলোর তদন্ত করতে আগ্রহ দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যদিও গতকাল পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) হায়দার আলী গতকাল সময়ের আলোকে সময়ের আলোকে বলেন, র‌্যাবের দেওয়া চিঠির অগ্রগতি বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য জানা নেই। বিষয়টি জেনে জানানো হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, বিভিন্ন সংস্থার কাছে তদন্তভার যাওয়াটা অন্যায় নয়। কিন্তু যদি নতুন কোনো তথ্য না থাকে তবে সাধারণ মানুষ এগুলোকে নিজেদের তৈরি ‘গেম’ মনে করবে এবং আস্থার সঙ্কট তৈরি হবে। চলচ্চিত্রের পরীমণি কীভাবে মাদকের আসরের পরীমণি হলো সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।
তদন্তের স্বার্থে যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ : সিআইডি
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেছেন, চিত্রনায়িকা পরীমণি, পিয়াসা ও মৌর মামলার বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। আমরা বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে ডেকেছি, আরও বিভিন্নজনকে ডাকব। তবে মিডিয়ায় আগেই তাদের নাম নিশ্চিত না হয়ে প্রচার করা উচিত নয়। গতকাল মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা বেশ কয়েকজনকে ডেকেছি। যাদের ডাকব না আপনারা মনে করবেন এসব মামলার সঙ্গে আপনাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। যদি আপনাকে আমাদের প্রয়োজন হয় এবং আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে থাকে, তা হলে আমরা আপনাকে ডাকব। কেউ যদি মিথ্যা বলে ডাকে তা হলে আমাদের কাছে এসে বললে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, আমরা অভিযুক্ত সবার বাসায় অভিযান চালিয়েছি। ৩টা জিপ, একটা বিএমডব্লিউ, একটা মাজদা এবং একটা ফেরারি গাড়ি জব্দ করেছি। মোবাইল জব্দ করেছি। আমরা চেষ্টা করব নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সবগুলো মামলার তদন্ত শেষ করতে। তবে অনলাইন, পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসবের সঙ্গে জড়িত অনেকের নাম এসেছে। এ রকম খ-চিত্র এলে অনেকের সম্মানহানি হয়। আমরা তদন্ত করছি, আমাদের সময় দেন, আমরাই তদন্ত শেষে সব জানিয়ে দেব।
সিআইডি প্রধান বলেন, এ পর্যন্ত ১৫টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সিআইডিতে তদন্তাধীন আটটি। এসব মামলায় মোট ১০ জন আসামি রয়েছেন, যার মধ্যে আটজন এখন আমাদের কাছে রয়েছেন। দুজন অন্য মামলায় রিমান্ডে আছেন। তাদের রিমান্ড শেষে আমাদের কাছে নিয়ে আসব। এই আটটি মামলায় আসামিরা আমাদের কাছে রিমান্ডে ছিলেন, কিন্তু আরও জিজ্ঞাসাবাদ থাকায় তাদের গতকাল আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ড আবেদন করলে তা মঞ্জুর হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা জব্দ হওয়া ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু করেছি। যেসব লিকার (মদ) পাওয়া গেছে, সেগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা চলছে। যারা এতদিন রিমান্ডে ছিলেন তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। বিভিন্ন রকম তথ্য পেয়েছি। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ফেলতে পারব।
মামলা সংক্রান্ত কারও বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজন পড়লে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। অফিসিয়ালি কারও বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তবে কয়েকজনকে এ বিষয়ে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তিনি আরও বলেন, আসামিদের সম্পত্তির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ ছাড়া পরীমণিসহ বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইডি প্রধান বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা আছে, আমরা সে বিষয়গুলো সামনে রেখেই এগোচ্ছি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুঝতে পারব মামলা কোনদিকে যাবে। আমাদের তদন্ত একদম পরিষ্কারভাবে চলছে, আগে থেকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে মাথায় রেখে আমরা তদন্ত করিনি। যেহেতু আসামিদের কাছ থেকে নানা রকম মালামাল জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো কোথা থেকে এসেছে, কারা টাকা দিয়েছে এবং উৎস কোথায় তা আমরা খুঁজে দেখছি।
জব্দ হওয়া গাড়িগুলো কার কার জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যে ছয়টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে সেগুলো কার কার নামে আছে, তার তথ্য জানতে বিআরটিএতে যোগাযোগ করেছি। এ ছাড়া গাড়িগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং দেশে এগুলো সঠিকভাবে আনা হয়েছে কি না তাও আমরা তদন্ত করে দেখছি। পরীমণির বাসা থেকে আমরা একটি গাড়ি জব্দ করেছি।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button