খেলা

আরেকটি স্বপ্নের জয়

হ্যাজলউডের বলটা উইকেটরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে সীমানাছাড়া করেই আফিফ হোসেনের সামান্য উদযাপন। মুষ্টিবদ্ধ হাত ঝাঁকিয়ে এই তরুণ যেন ঘোষণা করতে চাইলেন- আগের দিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া জয়টা ফ্লক ছিল না। নিজেদের যোগ্যতাতেই, নিজেদের ক্রিকেটীয় মান দেখিয়েই জিতেছে বাংলাদেশ। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আরও একবার অস্ট্রেলিয়া বধ, পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে সেটাই। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে অজিরা এদিন তোলে ১২১ রান। তাই টাইগারদের লক্ষ্য ছিল মামুলি। তবু জয়টা অনায়াস হবে, এমনটা ভাবা যায়নি, সেটা প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া বলেই। হারের আগে হার মেনে না নেওয়া যাদের চিরন্তন মনোভাব, তাদের বিপক্ষে জয়টা কি আর অনায়াসে আসে? তবে ছোট পুঁজি নিয়ে লড়াই করলেও নখ কামড়ানো উত্তেজনা ম্যাচে আনতে পারেনি অজি বোলাররা। তারপরও ৮ বল হাতে রেখে বাংলাদেশের পাওয়া ৫ উইকেটের জয়টা কষ্টার্জিতই।
ভাগ্যদেবীও যেন ছিলেন টাইগারদের পাশেই। কৃপার ফসলও বলা যায়! ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেও যেভাবে খাবি খেয়েছেন ব্যাটসম্যানরা, এলোমেলো শট খেলে যেভাবে বারবার বিপদ ডেকেছেন, ভাগ্যদেবী সহায় ছিলেন বলেই না চূড়ান্ত বিপদ ঘটেনি। একের পর এক ক্যাচ তুলেছেন শেখ মেহেদী, সাকিব আল হাসান, আফিফ হোসেনরা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো ফিল্ডারদের হাত পর্যন্ত পৌঁছেনি। আবার পৌঁছলেও তা তালুবন্দি করতে পারেননি। ম্যাচসেরা আফিফ তো ক্যাচ দিয়েও বেঁচে গেলেন, বল তালুবন্দি করেও ফিল্ডার সীমানার বাইরে পড়ে যাওয়ায় উল্টো পেলেন ছয় রান।
সহজ রানআউটের সুযোগ যেভাবে হাতছাড়া করল অস্ট্রেলিয়া, ভাগ্যদেবীর  কৃপাদৃষ্টি না থাকলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। ৬৭ রানে ৫ উইকেট হারানোর পরও যেভাবে ম্যাচটা বের করে আনলেন নুরুল হাসান সোহান আর আফিফ, সেটাও ভাগ্যেরই বরদান! দুই ওপেনার নাইম শেখ আর সৌম্য সরকারের ব্যর্থতা অনেকটা ঢেকে দিয়ে যখন ফিরলেন সাকিব, একের পর এক ক্যাচ তুলেও বেঁচে যাওয়া শেখ মেহেদী, মামুলি পুঁজি নিয়েও অস্ট্রেলিয়া তখন জয়ের স্বপ্নই দেখছিল। রানের খাতা খোলার আগেই যখন মাহমুদউল্লাহ ফিরলেন, জয়ের পাল্লাটা তখন অস্ট্রেলিয়ার দিকেই হেলে।
দারুণ ব্যাটিং প্রদর্শনীতে সেটা ধীরে ধীরে নিজেদের দিকে হেলিয়ে নিলেন সোহান আর আফিফ। কঠিন পরিস্থিতি মারিয়ে, প্রবল চাপ সামাল দিয়ে ষষ্ঠ উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন ৫৬ রানের জুটিটিই বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে আরেকটি স্মরণীয় জয়। ৫টি চার আর একটি ছক্কায় ৩১ বলে ৩৭ রান করার পথে অসাধারণ ব্যাটিং করেছেন আফিফ। তিন চারে ২১ বলে ২২ রান করার পথে তাকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন সোহান। এর আগে সাকিবের আগ্রাসী ২৬ আর শেখ মেহেদীর ২৩ রান মিটিয়েছে সময়ের দাবি। তবে দলের জয়ের কৃতিত্বের দাবিদার এদিনও ব্যাটসম্যানরা নন, প্রকৃত দাবিদার বোলাররাই।
বোলিংয়ের শুরুটা আগের দিনের মতো দমদার ছিল না। তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা খুব স্বচ্ছন্দে খেলেছেন, এমনটাও নয়। পাওয়ার প্লেতেই তুলে নেওয়া গেছে অতিথি দুই ওপেনারের উইকেট। এদিনও অ্যালেক্স ক্যারিকে ফিরিয়ে প্রথম সাফল্যগাথা লিখেছেন অফস্পিনার শেখ মেহেদী হাসান। ফিলিপকে বোল্ড করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। বোলিংয়ে এদিন সব থেকে উজ্জ্বল ছিলেন তারাই। সাকিব আল হাসান, শরিফুল ইসলামরাও ছিলেন দারুণ। সব মিলিয়ে বোলিংয়েই রোপিত হয়েছিল সাফল্য-স্বপ্নের বীজ।
আগের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে সব থেকে কম রানে আটকে যাওয়ার অনাকাক্সিক্ষত রেকর্ড গড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। এদিনও তারা উল্টেছে রেকর্ডের পাতা। ১২১ রান, বাংলাদেশের বিপক্ষে আগে ব্যাটিং করে তাদের সব থেকে কম রান তোলার রেকর্ড এটি। এরপর আর বলার অপেক্ষা রাখে না, এদিন বল হাতে কতটা দুর্দান্ত ছিলেন মোস্তাফিজ-শরিফুলরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাতিয়ে আসা মিচেল মার্শ, ময়েজেস হেনরিকসরা লম্বা সময় উইকেটে টিকে রইলেন, কিন্তু আগ্রাসী হওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেননি।
৩১ রানের মধ্যে দুই ওপেনার বিদায় নেওয়ার পর তৃতীয় উইকেটে ৫৭ রানের দারুণ জুটিতে অস্ট্রেলিয়াকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মার্শ আর হেনরিকস। তাদের ওই জুটিতে ১৩৫-১৪০ রানের পুঁজি গড়ার স্বপ্নটা পূর্ণ হতে দেননি মোস্তাফিজ-শরিফুলরা। শেষ বেলায় দুই পেসার ছিলেন দুর্দান্ত। ২৫ বলে ৩০ রান করা হেনরিকসকে বোল্ড করে সাকিব ফিরিয়ে দেওয়ার পরই দুই টাইগার পেসার চেপে ধরেন অস্ট্রেলিয়াকে। ২৩ রানে ৩ উইকেট নেওয়া মোস্তাফিজের স্লোয়ার আর কাটারের কোনো জবাবই যেন ছিল না অতিথিদের কাছে।
২৭ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল। ৫টি চারের মারে ৪২ বলে ৪৫ রান করা মিচেল মার্শকে এদিন থামিয়েছেন তিনিই। পরে অ্যাশটন টার্নারকে বানিয়েছেন দলপতি মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ। মোস্তাফিজ পরপর দুই বলে ম্যাথু ওয়েড আর অ্যাশটন অ্যাগারকে ফিরিয়ে যে ধাক্কা দেন, সেই ধাক্কা সামলে শেষ ৫ ওভার থেকে ৩১ রানের বেশি তুলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশকেও তাই বড় লক্ষ্য তাড়া করতে হয়নি। তা না হলে ম্যাচের চিত্রনাট্য হয়তো অন্যভাবেই লেখা হতো। ১২১ টপকাতেই যে ঘাম ছুটে গেছে।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button