
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের জাপান সফর শেষ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে জাপানের আতিথেয়তায় বাংলাদেশের প্রাপ্তির ঝুলিতে কী যোগ হল? এ আলোচনা সামনে এসেছে।
এ সফরকালে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চারটি সমঝোতা স্মারক, দুটি অনুদান চুক্তি এবং অভিপ্রায়পত্র সই হয়েছে। সহযোগিতার ক্ষেত্রও বেড়েছে।
দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যে যৌথ ঘোষণা এসেছে, সেখানে বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে জাপান ও বাংলাদেশ।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়াও বেসরকারি খাতে দুই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারকসহ সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপানে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী সোহরাব হোসেন কীভাবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে?
তার ভাষায়, “বর্তমান সময়টা বাংলাদেশের জন্য ভালো। জাপানের সাথে উন্নয়নের নতুন সোপান তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ছে।”
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে মূল্যায়ন করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, “আমি বলব, ‘দিস ইস ওয়ান অব দ্য মোস্ট সাকসেসফুল ট্রিপ বাই অ্যানি হেড অব দ্য স্টেট ইন রিসেন্ট টাইমস’।
“প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাপানের কাছে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যে সহযোগিতা ও সমঝোতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে, তাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সফল হয়েছে পরিপূর্ণভাবে।”
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি চীন সফর করেন।
চীনের পর প্রধানমন্ত্রী সোমবার চার দিনের সফরে জাপানের টোকিওতে পৌঁছান।
জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণা আসে।
এতে বলা হয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে এগিয়ে নেওয়া হবে। এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যযোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।
এর মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো হবে।
এ জন্য চারটি ক্ষেত্রে কাজ করা হবে—যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করতে পারে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ ঘোষণায়।
ঘোষণায় দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
মাতারবাড়ী ও অন্যান্য অবকাঠামো
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের বড় কেন্দ্রে গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকায় মেট্রোরেল লাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করবে দুই দেশ।
দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বাড়াতে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানো এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন।
এছাড়া জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত তা কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন দুই নেতা। এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য রয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম উত্তরণে এ চুক্তি সহায়তা করবে বলে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতেও জাপান আগ্রহী।
সমঝোতা স্মারক সই
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। অন্যদিকে বিনিয়োগ সহজ করতে কর, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ পাঠানো ও লাইসেন্স দেওয়ার মতো কার্যক্রমে নিয়মকানুন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে টহল জাহাজ দেওয়ার অনুদান সংক্রান্ত চুক্তিসহ মোট চারটি সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে।
এছাড়া দুটি প্রকল্পে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৬৫৬ বিলিয়ন ইয়েন অর্থাৎ ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি।
এর মধ্যে উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করতে টহল জাহাজ দেওয়ার অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে ২১২ কোটি ইয়েন (১৩.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন বিষয়ক একটি সহযোগিতার স্মারক (এমওসি) সই হয়েছে।
জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়
এছাড়া জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়ে সই হয়েছে লেটার অব ইনটেন্ট বা প্রাথমিক সমঝোতাপত্র।
যে দুটি প্রকল্পে ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে সেগুলো হল, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন ও উপজেলা গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেইজ ২)। এর মধ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পে ১ হাজার ৫৮৮ বিলিয়ন ইয়েন (১০০.৮ মিলিয়ন ডলার) ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে উপজেলা গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেইজ ২) এর জন্য পাওয়া গেছে ৩ হাজার ৬৮ বিলিয়ন ইয়েন (১৯৪.৭ মিলিয়ন ডলার) ঋণের প্রতিশ্রুতি।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ১৭টি সমঝোতা সই হয়েছে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেটরো) মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে। এসব সমঝোতায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
এ সফরে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামের সংলাপে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। সেখানে জাপানের বিভিন্ন বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের আগ্রহের কথাও বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান আমাদের পাশে ছিল। এখন আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের সঙ্গে মিলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলুন, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করুন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এগিয়ে চলুন।
“আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট। আসুন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে পরিণত করি। আমাদের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি করি এবং আমাদের দুই মহান দেশের জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করি।”
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান–বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের যৌথ আয়োজনে জেট্রোর প্রধান কার্যালয়ে বিনিয়োগ ফোরামের এ সম্মেলন হয়।
চারদিনের সফরে জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্ণর আমাকাওয়া কাজুহিকো,জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট কাতাওয়াকা সুসুমুর, ইউনিক্লোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদাশি ইয়ানাই প্রমূখ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
এছাড়া জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিবা প্রিফেকচাররের ফুতসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এবং বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য দুই দেশের মধ্যে কর্মসংস্থান বিষয়ক এমওসি হয়েছে।
জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও সহযোগিতার একটি স্মারক সই হয়েছে।