রাজশাহী বিভাগসারাদেশ

মাসে গড়ে ১৭ জন আত্মহত্যা করে থাকে

বগুড়ায় কিশোর-তরুণীদের প্রেমে ব্যর্থতা আর প্রবীণদের একাকিত্বের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। শুধু কিশোর, তরুণ, কিশোরী ও যুবতীই নয়, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পূরুষদের মধ্যেও আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বগুড়ায় সিরিজ আত্মহত্যার ঘটেই চলেছে। এর কোন প্রতিকার নেই। সচেতনতার অভাবে বগুড়ায় আত্মহত্যা বাড়ছে।

বগুড়ার সবচেয়ে হৃদয় বিদারক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে শিবগঞ্জে। সেখানে গত সোমবার রাত ১০টার দিকে প্রেমিক-প্রেমিকা আত্মহত্যা করেন। আজমেরি খাতুন (২০)  নামে বিবাহিত এক কলেজ ছাত্রী ও তার প্রেমিক সবুজ মিয়া (২২) আধা ঘণ্টার ব্যবধানে নিজ নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। উপজেলার মাঝিহট্ট ইউনিয়নের মাসিমপুর চালুঞ্জা গ্রামে ওই কলেজ ছাত্রী এবং একই ইউনিয়নের দামগারা কারিগরপাড়া গ্রামে সবুজ মিয়া আত্মহত্যার করেন।

আজমেরি খাতুনের সঙ্গে সবুজ মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আজমেরিদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল। পক্ষান্তরে সবুজ সড়ক মেরামত কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিক ছিলেন। যে কারণে আজমেরিদের পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। মাঝিহট্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী শাহানা বলেন, প্রায় এক মাস আগে আজমেরিকে মোবাইল ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে একই ইউনিয়নের খেউনি বিন্নাচাঁপড় গ্রামের বাসিন্দা মালয়েশিয়া প্রবাসী মিজানুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে দেয়। এ বিয়ে মানতে পারেনি আজমেরি। স্বামী বিদেশে অবস্থান করলেও আজমেরি তার শ্বশুর বাড়িতে যাতায়াত করতো। তবে বিয়ের পরেও আজমেরি যে সবুজের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল সেটা হয়তো পরিবারের সদস্যরা জানতো না।

’শিবগঞ্জ থানার ওসি দীপক কুমার দাস জানান, সোমবার রাতে আজমেরির সঙ্গে সবুজের কথা হয়। তখনই হয়তো তারা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রথমে আজমেরি তার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে রাত ১০টার দিকে সবুজ তার ঘরে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করে।

জেলা পুলিশের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বিদায়ী বছর ২০২১ সালে জেলায় ২০৫ জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে বগুড়া জেলায় গড়ে মাসে ১৭ জন আত্মহত্যা করে থাকেন।

চমকে ওঠার মত খবর হলো বগুড়া জেলার ১২ উপজেলায় গত ১২ বছরে আত্মহত্যা করেছেন আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে বিদায়ী বছরে ২০২০ সালে ২৩২ জন আত্মহত্যা করেন। বিদায়ী বছর ২০২১ সালে আত্মহত্যা করেন আরও ২০৫ জন। সেইসাথে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত আরও ২০ আত্মহত্যা করেন।

আত্মহননকারিদের অর্ধেকই নারী। গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষপান করেই সবচেয়ে বেশি বগুড়ার মানুষ আত্মহত্যা পথ বেছে নেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্থ ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ায় আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সব বয়সী মানুষের মধ্যেই বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। ফেসবুকে আপত্তিকর ও অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ছবি ভাইরাল হওয়ায় ক্ষোভে ও লজ্জায় অনেক নারী আত্মহত্যা করেন। প্রেমে ব্যর্থতা, একাকিত্ব, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যাও আত্মহত্যার জন্য দায়ী। প্রেমে ব্যর্থতার কারনে তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিষন্নতা, নানামুখি বৈষম্য ও প্রতারণার কারনেও অনেক মানুষ আত্মহত্যা করছেন। বগুড়ায় আত্মহত্যার তালিকায় পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের নাম যুক্ত হচ্ছে। ছেলে, বুড়ো, নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত কেউ আত্মহত্যার প্রবণতায় ঝুঁকির বাইরে নয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী নেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিজ্ঞজনরা বলেন,ব্যাপক সচেতনতার অভাবে ঝরে পড়ছে মূল্যবান জীবন।

বিষ বা কীটনাশক হলো আত্মহত্যার প্রধান উপকরণ। এ ছাড়া ঘরের তীর বা সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় ফাস ও ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী আত্মহত্যা মহাপাপ। আইনেও আত্মহত্যা করতে গিয়ে কেউ বেঁচে গেলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্ত তারপরও দিন দিন আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, পরকীয়া, যৌতুক, পরীক্ষা ও প্রেমে হয়রানির শিকার এবং অন্যকে দেখে উৎসাহিত হওয়াসহ নানা কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

মাস খানিক আগে জেলা পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১০ সালে ১৭৪ জন, ২০১১ সালে ১৭৭ জন, ২০১২ সালে ২০৬ জন, ২০১৩ সালে ২৩০ জন, ২০১৪ সালে ২৫৩ জন, ২০১৫ সালে ২৫০ জন, ২০১৬ সালে ১৯৮ জন, ২০১৭ সালে ২২১ জন, ২০১৮ সালে ২৩০জন, ২০১৯ সালে ২৭৭ জন, ২০২০ সালে ২৩২ জন ও বিদায়ী বছর ২০২১ সালে ২০৫ জন আত্মহত্যা করেন। যার মধ্যে অর্ধেকই নারী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১২ বছরে বগুড়া জেলায় মোট ২ হাজার ৬৬০ জন আত্মহত্যা করেছেন।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর,ধুনট ও শিবগঞ্জ উপজেলা এলাকা আত্মহত্যা প্রবণ এলাকা। এই চার উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের রেজিষ্টার ডা. শাহরিয়ার ফারুক বলেন, বিষন্নতা থেকে মানুষ আত্মহত্যা করে। আবার আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করে থাকে। বিশেষ করে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তারা বিষন্নতা থেকে বেশি করেন। সেইসাথে যারা কিশোর, তরুণ ও যুবক তারা আবেগের বশে বেশি আত্মহত্যা করে। এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সজাগ থাকতে হবে। পরিবারের কারোর মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা দিলে তাকে নিয়ে চিকিৎসকের শরন্নাপন্ন হতে হবে।

এ বিষয়ে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক আবু সায়েম বলেন, মানসিক পারবেশ ও সামাজিক কারণে আত্মহত্যা বাড়ছে। মুলত হতাশা থেকে মানুষ বেশি আত্মহত্যা করে। সেই সাথে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সিজোফ্রেনিয়া, উদ্বেগ, গোলযোগসহ বিভিন্ন মানসিকরোগের কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। তিনি বলেন, কেউ অপমান সহ্য করতে না পেরে তাৎক্ষনিকভাবে আত্মহত্যা করেন। আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় ভুগতে ভুগতে এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করেন। সেইসাথে মাদকাসক্তির কারনেও অনেকে আত্মহত্যা করেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে তাকে সময় দিতে হবে। তাকে কাউন্সিলিং করতে হবে। তার হতাশার কারন জেনে তারপাশে থেকে আত্মহত্যায় নিরৎসাহিত করতে হবে। এ ছাড়া মানসিক চিকিৎসাও করাতে হবে।

এ ব্যাপারে বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, পুলিশের পক্ষে আত্মহত্যা ঠেকানো মুশকিল। যার মধ্যে আত্মহত্যার লক্ষণ দেখা যাবে তাকে পরিবার থেকেই কাউন্সিলিং করে আত্মহত্যায় নিরুৎসাহিত করতে হবে। সন্তানদের সাথে মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদেরও ভূমিকা নিতে হবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারেেন আত্মহত্যায় অনেকে প্রভাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিলে প্রয়োজনে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে তাকে নিয়ে যেতে হবে। সেইসাথে আত্মহত্যা রোধে সামাজিকভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button