রাজশাহী বিভাগসারাদেশ

আমের রাজধানী নওগাঁয় দেড় হাজার কোটি টাকা বার্ণিজ্যের সম্ভবনা

নওগাঁ প্রতিনিধি: ধান উৎপাদনে এ জেলাকে যেমন বৃহৎ জেলা হিসেবে গন্য করা হয়; তেমনি সবজির জন্যও বিখ্যাত। এসবের পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিজাত পন্য হিসেবে আরেকটি নাম হচ্ছে আম। নওগাঁ জেলা আমের জন্য বিখ্যাত। এখানকার আম সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে আমের রাজধানী হিসেবে মনে করেন। তবে লকডাউন ও করোনা ভাইরাসের কারণে সংকায় আছেন নওগাঁর আম ব্যবমায়ী ও আম চাষীরা। লকডাউনের কারনে সময়তম আম পরিবহনের বাড়ী ও শ্রমিকের ঠিক মত আসতে পারছে না।

জানা গেছে, জেলার বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পতœীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। পানি স্বল্পতার কারণে বছরের একটি মাত্র ফসল ধানের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে ধানের আবাদ ছেড়ে আম চাষে ঝুঁকেছেন চাষীরা। দেশে যত ধরনের আম উৎপাদিত হয় এ অঞ্চলটিতে তার প্রায় সব ধরণ ও আকৃতি-প্রকৃতির আম উৎপাদিত হয়। গত এক যুগ আগে যে জমিতে ধান চাষ হতো। সেখানে এখন আম চাষ করা হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলের চাষীরা আমচাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যেখানে আ¤্রপালি, গোপালভোগ, ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা, ঝিনুক, বারী-৪ ও গুটি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে।

এখানকার আমের আকৃতি ও গঠনগত অবয়ব কেবল দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় নয়; বরং খেতেও সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। আম চাষ খুব লাভজনক একটি ফসল হওয়ায় ধানের চাষাবাদ ছেড়ে আমচাষের দিকে অধিক হারে ঝুঁকে পড়েছে। এ জেলাটি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকেও ছাড়িয়ে গেছে। পোরশা ও সাপাহারে উপজেলায় প্রায় তিনশতাধিক মৌসুমি আমের আড়ৎ গড়ে ওঠে। যেখানে থেকে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে জেলায় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। গত বছর ছিল ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে। গত বছরের থেকে ১ হাজার ৭৫ হেক্টর বেশী জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। উপজেলা ভিত্তিক আম বাগানের পরিমাণ হচ্ছে- সদর উপজেলায় ৪৪০ হেক্টর, রানীনগরে ৩৫ হেক্টর, আত্রাইয়ে ১২০ হেক্টর, বদলগাছীতে ৩৩৫ হেক্টর, মহাদেবপুরে ৬২৫ রহেক্টর, পতœীতলায় ৩ হাজার ১৫ হেক্টর, ধামইরহাটে ৬৭৫ হেক্টর, সাপাহারে ৮ হাজার ৫২৫ হেক্টর, পোরশায় ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর, মান্দায় ৪০০ হেক্টর এবং নিয়ামতপুরে ১ হাজার ১৩০ হেক্টর।

জেলা প্রশাসনের বেধে দেওয়া সময় অনুযায়ী গত ২০ মে থেকে গুটি জাতের আম পাড়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। ঘোষিত সময় অনুযায়ী আম না পাকায় সময় পিছিয়ে ২৫ মে আনুষ্ঠানিক ভাবে পাড়া শুরু হয়। এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জেলায় চলছে প্রশাসনের বিশেষ লকডাউন। আগামী ৯জুন পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। এ কারণে বাহিরের জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে পারতে পারছে না। এতে দাম তুলনামুলক কম যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা।

সাপাহারের বাজারে গুটি, গোপালভোগ ও খিরসাপাতা(হিমসাগর) পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে গুণগত মানভেদে গোপালভোগ ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খিরসাপাতা প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। এছাড়া গুটি আম বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকা দরে।

পোরশার আমচাষী আশাদুর রহমান বলেন, ২৫০ বিঘা জমিতে আম চাষ করেছি। হিম সাগর ও গোপাল ভোগ আম নামানো শুরু করেছি। করোনা ভাইরাসের কারনে লোকজন ও গাড়ী আসতে পারছে না। হিম সাগর বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা দরে। গোপাল ১২০০-১৩০০ টাকা করে। দেশী জাতের ৫০০-৬০০টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রাথমিক ভাবে দাম মোটামুটি ঠিক আছে। তবে চাষীরা আরো ভাল দাম পেতো। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে আমচাষীদের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। লকডাউনের কারণে দুরদুরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেনা। এছাড়া অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়া সার্ভিসের মাধ্যমে কিছুটা বিক্রি করা হচ্ছে।

পোরশার আম ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমার ৪৫০ বিঘা জমিতে আম্্রপালি আমের আগান আছে। আগামী ২০জুন থেকে আম বাজারে আসবে। করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যবসায়ীরা আসতে পারছে না। গত বছর ১৫০ বিঘা জমিতে যে পরিমান আমে ব্যবসা হয়েছিল সেই পরিমান ব্যবসা হবে কি না সংকায় আছি। তবে শেষ পর্যন্ত ভালো ব্যবসা হবে বলে আশা করছি।

সাপাহারের আম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, লক ডাউনের কারণে বাহিরের ব্যবসায়ীরা সময়মত আসতে পারছেন না। এ কারণে আমের দাম তুলনামুলক কম। বিভিন্ন পরীক্ষা করার পর তাদেরকে পাঠনোর কারণে আম বেচাকিনা করতে দেড়ী হচ্ছে। আমরা সংকার মধ্য আছি। তবে লকডাউন শেষ হলেই দাম বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সামশুল ওয়াদুদ বলেন, চলতি মৌসুমে ২৫হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ও শীলা বৃষ্টি না হওয়ার কারণে আমের ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১২ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। সেই হিসেবে আম উৎপাদনের পরিমাণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে ৩ লক্ষ ১০ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।

নওগাঁ জেলা প্রশাসক হারুন অর রশীদ, করোনা ভাইরাসের কারনে আম বাজারে পরিবহন ও শ্রমিক আসতে কোন প্রকার সমস্যা নাই। এখন বাজারে পুরো দমে আম আসে নাই। ১৫ জুনের পরে আ¤্রপালি বাজারে আসবে। আ¤্রপালি আম ৭০ পারসেন্ট চাষ হয়েছে। আম্্রপালি বাজারে আসলে তখন আমরা পুরো দমে ব্যবসা করতে পারবো। ব্যবসায়ীদের সংকার কোনো কারন নেই। তিনি আরোও বলেন, আম ব্যবসায়ী ও চাষীদের কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button