অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে শঙ্কায় আইএমএফ

দিন দিন বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর এই ঋণ খেলাপি বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এজন্য তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কেন বাড়ছে, সংজ্ঞা পরিবর্তনের কারণে এর ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে রিট করে বিপুল খেলাপি ঋণ হিসাবের খাতায় না রাখার বিষয়েও প্রশ্ন করেছে। পাশাপাশি তারা এমন অবস্থা থেকে প্রতিকারের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগতভিত্তি শক্তিশালী করার পরামর্শ প্রদান করেছে।

সম্প্রতি আইএমএফের চার সদস্যের এক প্রতিনিধি দল দেশে এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে পৃথক দুটি বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচলা করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কিভাবে কমানো যায় তারও উপায় খুঁজতে বলার পরামর্শ দেন।

বৈঠকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের এটি একটি রুটিন ভিজিট। আইএমএফের সাথে চুক্তির শর্ত হিসেবে তারা ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি ও অবনতি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চান। এরই অংশ হিসেবে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। খেলাপি ঋণ এমন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চান। আর এ থেকে তারা উত্তরণের উপায় জানতে চান। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত কোনো দুর্বলতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বলেন।

ওই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে আইএমএফের প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।

প্রসঙ্গত, দেশে বেড়েই চলেছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। গত ১০ বছরে ঋণ খেলাপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। ফলে দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১০ সালে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা আর ২০১১ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায়।

তবে ২০১২ সাল থেকে এই ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। আবার ২০১৩ সালে খেলাপি ঋণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমে ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১৪ সালে আবার বেড়ে যায় এই খেলাপি ঋণ। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে তখন সেটি দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়। এভাবেই উত্থান-পতন হয় খেলাপি ঋণ।

এরপর থেকে ক্রমাগতহারে তা বাড়তে থাকে ঋণ খেলাপির পরিমাণ। ২০১৫ সালে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে (সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৫৯টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংক ৪১টি, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক ৯টি এবং বিদেশী ব্যাংক ৯টি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ৯টি ব্যাংকের ৪৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা খেলাপী ঋণ এবং বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪৯ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসে দেশের ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বা ৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারি-মার্চে রাষ্ট্রীয় ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড়ে খেলাপি ঋণ বাড়লেও একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ কমেছে।

এই মার্চ শেষে সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১২ হাজার ৬১ কোটি টাকা থাকলেও চলতি বছরের প্রথম তিনমাসে তা ১৭৬ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকায়।

জনতা ব্যাংকের এই ঋণ ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা থেকে ৪ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা বেড়ে ২১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা থেকে ৩৯৬ কোটি টাকা বেড়ে ৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ১৭২ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকায়।
আর বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) এই ঋণ ৮৯৭ কোটি টাকা ১৩ কোটি বেড়ে ৯শ’ কোটি টাকা হয়েছে।

তবে তিন মাসে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক ৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করতে পেরেছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘আজ থেকে খেলাপির ঋণ এক টাকাও বাড়বে না’। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরও খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ৯৬২ টাকা বেড়েছে। আর সরকারি ছয় ব্যাংকের বেড়েছে ৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘তিন বছর আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি, খেলাপি ঋণ আদায় করতে। আমি মনে করি, এ যাত্রায় অনেকটা সফলতার মুখও দেখেছি। খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়া চলমান আছে, অব্যাহত থাকবে’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের সময় শেষ হয়ে যায়নি। সরকারি ব্যাংকের ঋণ আদায়ের আইনগত জটিলতাগুলো সমাধান করতে হবে। এতে আদালতের নির্দেশে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো এ সময় পর্যন্ত ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে।

তবে এই খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে নানা কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি কমে গেছে। এছাড়া ডিসেম্বর শেষে যেসব ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল তা পরবর্তী তিন মাসে আদায় না হওয়ায় আবার তা খেলাপি হয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ আছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করেন না। এখন তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে।

আবার কেউ কেউ আছেন, যারা ব্যবসায় লোকসানের কারণে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এজন্য তাদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য নবায়ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা উচ্চ আদালতে রিট করায় তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে স্থগিত করে রাখা হয়েছে।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button